প্রিন্ট ও ডাউনলোড সংস্করণ সুন্দর A4 প্রিন্ট, PDF এবং HD JPG
← ফিরে যান
PDF ডাউনলোড চাপলে Print Destination থেকে Save as PDF নির্বাচন করুন।
nationaldailyamaderdesh.com
nationaldailyamaderdesh.com ঢাকা মিরপুর.১০
01880008666 | nationaldailyamaderdesh@gmail.com
সারাদেশ

শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

প্রতিবেদক: জাতীয় দৈনিক আমাদের🔳দেশ প্রকাশ: Sep 22, 2026 প্রিন্ট: 08 Nov 2026, 12:10 PM
শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

মাগুরা প্রতিনিধি, মোঃ শফিকুল ইসলাম সুমন

মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে অনিয়ম এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মাদরাসাটিতে দীর্ঘদিন ধরে সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা মো. হাফিজুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করেন না এবং প্রতিষ্ঠানের একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মাদরাসায় সরেজমিনে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সুপারকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদকের দাবি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায়ই সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে মাদরাসা থেকে চলে যান। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুপার।

শিক্ষকের অনুপস্থিতি ও প্রক্সির অভিযোগ

মাদরাসার কৃষি শিক্ষক শিল্পীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি নিয়মিত ক্লাস নেননি এবং তার পরিবর্তে ‘সোহাগ’ নামে এক ব্যক্তি প্রক্সি দিয়েছেন। এছাড়া সহকারী সুপার মনিরুজ্জামানের অসুস্থতার সুযোগে তার ছেলে শাকিবও প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে মাদরাসার হাজিরা খাতা ও অন্যান্য নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

নিয়োগে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

লাইব্রেরিয়ান পদে আল আমিনের নিয়োগের সময় ১২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের পরও তিনি নিয়মিত মাদরাসায় উপস্থিত হন না এবং এখনও নিয়মিত বেতন পাননি।তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সুপারের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

পাঁচ লাখ টাকার সরকারি অনুদান নিয়ে প্রশ্ন

মাদরাসাটি পারফরম্যান্স বেজড গ্র্যান্টস ফর সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস (PBGSI) স্কিমের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা পেয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। তাদের দাবি, অনুদানের অর্থ নির্ধারিত খাতে যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষক প্রণোদনা খাতে ২০ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও প্রায় ৮০ হাজার টাকা শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। অন্যান্য খাত—বই ও লাইব্রেরি, শিক্ষা উপকরণ ও গবেষণাগার সরঞ্জাম, বিশুদ্ধ পানি, ছাত্রীদের পৃথক শৌচাগার বা কমনরুম, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুবিধা উন্নয়ন,এসব খাতে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব খাতে সরেজমিন পরিদর্শন ও হিসাব-নথি যাচাই করে তদন্ত করা প্রয়োজন।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ

প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সুবিধা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র প্রায় ১৭ হাজার টাকার বিল-ভাউচার দেখানো হয়েছে। বাকি অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

ফ্যান, আসবাব ও অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন

মাদরাসার জন্য বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সিলিং ফ্যান দিয়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, অবসরপ্রাপ্ত সচিব মোজাম্মেল হক কয়েক বছর আগে ৮টি, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক সুমন কয়েক মাস আগে ৬টি এবং তানিয়া ইট ব্রিকসের মালিক কামাল হোসেন কয়েকটি সিলিং ফ্যান দিয়েছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অর্থায়নেও একটি ফ্যান কেনা হয়েছে।তবে মাদরাসার বিভিন্ন উন্নয়নকাজ ও ক্রয়সংক্রান্ত হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগকারীরা সঠিক হিসাব যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

জমি ও পুকুর ইজারা নিয়েও অভিযোগ

মাদরাসার জমি ও পুকুর ইজারা দেওয়া এবং সেখান থেকে পাওয়া অর্থের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ শতক জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে পুকুর ও পুকুরের পাড়ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।এসব ইজারার অর্থ মাদরাসার হিসাব খাতে জমা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

গাছ বিক্রি ও সংস্কারকাজের অভিযোগ

মাদরাসা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন গাছ কেটে বিক্রি করা এবং পরে সেখানে সংস্কারকাজ করার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া মাদরাসার সংস্কার, রং ও অন্যান্য কাজে স্টাফদের দিয়ে কাজ করিয়ে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরীক্ষার ফি নিয়েও অভিযোগ

২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় ১৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ১৩ জন উত্তীর্ণ ও ৬ জন অনুত্তীর্ণ হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা এবং মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে মাদরাসার রসিদ ও হিসাবপত্র যাচাইয়ের দাবি রয়েছে।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে টাকা দেওয়ার দাবি নিয়ে বিতর্ক

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথিলা খাতুনকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি সাংবাদিকদের সামনে করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে মিথিলার মা লাকী বেগম দাবি করেছেন, তার মেয়েকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়নি। লাকী বেগমের ভাষ্য, তার মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার ১ হাজার ৫০০ টাকা উপবৃত্তি পেয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে ৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা বলতে শেখানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে তার কাছে মোবাইল ফোনের অডিও রেকর্ড রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

নৈশপ্রহরীর বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ

মাদরাসার নৈশপ্রহরী জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধেও সুপারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি শিক্ষার্থী মিথিলাকে সাংবাদিকদের সামনে আনার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কমিটি গঠন নিয়ে জটিলতা

মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে মামলার বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

অভিভাবকদের অভিযোগ

মাদরাসার অভিভাবক সদস্য আসাদুল শিকদার, আসিফ শিকদার, ওয়াদুদ বিশ্বাস, সিদ্দিকুর রহমান, বশির তরফদার, নাজমুল শিকদার, ফখরুল ইসলাম, আতিয়ার মোল্লা, আনোয়ার হোসেন ও নাজিমসহ স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, সুপার মাওলানা মো. হাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এককভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।তারা মাদরাসার আয়-ব্যয়, সরকারি বরাদ্দ, জমি-পুকুরের ইজারা, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন ক্রয় ও উন্নয়নকাজের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান।

সুপারের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, কৃষি শিক্ষক শিল্পী হার্টের অপারেশন করা রোগী ও অসুস্থ। তিনি নিয়মিত আসেন এবং প্রয়োজন হলে অন্য কেউ এক-দুটি ক্লাস নেন।তবে অভিযোগের অন্যান্য বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে ফোন কেটে দেন বলে প্রতিবেদকের দাবি।

শিক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্য

শালিখা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল গনি বলেন, “শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগটি শুনেছি। বিষয়টি আমি দেখছি।”

মাগুরা জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সহীলুদ্দীন বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলব। পাশাপাশি শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও বিষয়টি জানানো হবে।”

শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, “শতখালী দারুল উলুম দাখিল মাদরাসার বিষয়টি জানলাম।”

স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মাদরাসার হিসাবপত্র, সরকারি অনুদানের ব্যয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি, নিয়োগসংক্রান্ত নথি, জমি-পুকুর ইজারা এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেন যাচাই করা হোক। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্পষ্ট হবে বলে আশা করছেন তারা।

© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ